হিলফুল ফুজুল কি? হিলফুল ফুজুল গঠনের প্রেক্ষাপট, ঘটনাবলী ও গুরুত্ব


ভূমিকা: ইসলামের ইতিহাসে হিলফুল ফুজুল (আক্ষরিক অর্থে: কল্যাণকর বা মহৎ ব্যক্তিদের অঙ্গীকার) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা । নবুয়ত প্রাপ্তির বহু পূর্বে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর যৌবনে মক্কার কতিপয় সম্ভ্রান্ত ও যুবক এই কল্যাণমূলক চুক্তিতে আবদ্ধ হন । এটি ছিল এমন এক প্রেক্ষাপটে সংগঠিত একটি মহৎ উদ্যোগ, যখন আরবের গোত্রীয় সংঘাত ও অরাজকতা বিদ্যমান ছিল।

হিলফুল ফুজুল প্রেক্ষাপট ও মক্কার সামাজিক পরিস্থিতি: হিলফুল ফুজুল গঠিত হয়েছিল আনুমানিক ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে, যখন মহানবী (সা.)-এর বয়স প্রায় ২০ বছর । সেসময় মক্কার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক।

অরাজকতা ও গোত্রীয় সংঘাত: মক্কায় কোনো কেন্দ্রীয় শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থা ছিল না। ফলে গোত্রীয় সংঘাত, রক্তপাত এবং প্রতিশোধের সংস্কৃতি বিদ্যমান ছিল।

দুর্বলদের নিপীড়ন: ক্ষমতাশালী গোত্রগুলি দুর্বল, অসহায় এবং মক্কায় আগত বহিরাগত ব্যবসায়ীদের ওপর সহজেই অত্যাচার করত । তাদের কোনো বিচার চাওয়ার বা পাওয়ার স্থান ছিল না।

ঘটনাবলী: চুক্তি গঠন

ইয়েমেনি ব্যবসায়ীর ঘটনা: চুক্তি গঠনের মূল সূত্রপাত হয় ইয়েমেনের যবাইদ গোত্রের একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্র করে । এই ব্যবসায়ী কিছু পণ্য নিয়ে মক্কায় আসেন এবং মক্কার ক্ষমতাশালী নেতা আস ইবনে ওয়াইল আস-সাহমি তার পণ্য কিনে নেন, কিন্তু মূল্য পরিশোধ করতে অস্বীকার করেন।

অসহায়ত্ব: যবাইদ ব্যবসায়ী কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রের কাছে বিচার চেয়ে ব্যর্থ হন; কেউ তাকে সাহায্য করতে সাহস করেনি।

আহ্বান ও সমাবেশ: অসহায় লোকটি পাহাড়ে উঠে উচ্চস্বরে তার দুর্দশা বর্ণনা করে কুরাইশদের প্রতি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আহ্বান জানান । এই করুণ আর্তি মক্কার কিছু যুবকের মনে রেখাপাত করে।

জড়ো হওয়া: কুরাইশদের মধ্যে হাশিম, মুত্তালিব, আসাদ, যুহরাহ এবং তায়ম গোত্রের যুবকরা এই মহৎ কাজে সাড়া দেন । তাঁরা আবদুল্লাহ ইবনে জুদ'আন নামক এক ব্যক্তির বাড়িতে একত্রিত হন ।

হিলফুল ফুজুলের মূল অঙ্গীকার (গুরুত্ব):

১. ন্যায় প্রতিষ্ঠা: তাঁরা শপথ করেন যে, দেশে (মক্কায়) যেখানেই কোনো অত্যাচারিতকে দেখতে পাবেন, তাঁর পাশে দাঁড়াবেন ।

২. প্রাপ্য ফিরিয়ে দেওয়া: তাঁরা অঙ্গীকার করেন যে, দুর্বল বা মজলুম ব্যক্তিকে তার ন্যায্য অধিকার (হক) ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করবেন ।

৩. অত্যাচারীর বিরুদ্ধে অবস্থান: তাঁরা অত্যাচারী বা জালিমের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে অবস্থান নেবেন।

গুরুত্ব ও তাৎপর্য:

১. নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা: এটি ছিল আরবের রক্তক্ষয়ী ও অরাজক পরিবেশে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রথম সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা । এই চুক্তি নৈতিকতার মানদণ্ডকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে ।

২. সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তা: এটি মক্কার দুর্বল, অসহায়, বিধবা, এতিম এবং বিদেশাগত ব্যবসায়ীদের জন্য একটি নিরাপত্তা জাল হিসেবে কাজ করেছিল । এটি ছিল নির্যাতিতদের জন্য এক ভরসার স্থল ।

৩. মহানবী (সা.)-এর সম্পৃক্ততা (কুরআন ও হাদিসের আলোকে দলিল): এই চুক্তিতে মহানবী (সা.)-এর সক্রিয় অংশগ্রহণ এর গুরুত্বকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে । নবুয়ত প্রাপ্তির পরেও তিনি এই অঙ্গীকারের প্রশংসা করেছেন ।

হাদিসের দলিল: মহানবী (সা.) বলেছেন- "আমি আবদুল্লাহ ইবনে জুদ'আনের গৃহে এমন এক চুক্তিতে উপস্থিত ছিলাম যে, তার বিনিময়ে আমি লাল উটের মালিক হতেও পছন্দ করব না। আর ইসলামের যুগেও যদি আমাকে সেই চুক্তির প্রতি আহ্বান করা হয়, তবে আমি সানন্দে সাড়া দেব।" (সিরাতু ইবনে হিশাম, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা: ১৩৩-১৩৪; সুনানে কুবরা বায়হাকী, হাদিস: ১২৯২০) ।

কুরআনের আলোকে প্রাসঙ্গিকতা: যদিও হিলফুল ফুজুল সরাসরি কোরআনের বিষয় নয়, তবে কোরআনের বহু আয়াত এর মূল চেতনাকে সমর্থন করে । যেমন, আল্লাহ তা' আলা বলেন:

"হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাক্ষ্যদাতা হিসেবে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হও।" (সূরা নিসা, ৪:১৩৫)

"আর তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতির ব্যাপারে পরস্পর সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে পরস্পর সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা, ৫:২)

উপসংহার: হিলফুল ফুজুল ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন আরবে ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের এক ঝলকানি । এটি প্রমান করে যে, মহানবী (সা.) শৈশব থেকেই শুধু ধর্মীয় নেতাই ছিলেন না, বরং একজন সমাজ সংস্কারক এবং দৃঢ় নৈতিক চরিত্রের অধিকারী ছিলেন । এই চুক্তির মাধ্যমে তিনি পৃথিবীতে শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধের যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা-ই পরবর্তীকালে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয়েছে । হিলফুল ফুজুল আজীবন এই শিক্ষা দেয় যে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং মজলুমের পক্ষে অবস্থান নেওয়া কেবল একটি ধর্মীয় কর্তব্যই নয়, বরং প্রতিটি সচেতন ও বিবেকবান মানুষের মৌলিক দায়িত্ব ।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url