কিয়াসের পরিচয়, কিয়াসের রুকন ও হুকুম, অত:পর কিয়াসকে দলিল হওয়ার বিষয়ে প্রমাণ সহ স্ববিস্তারে আলোচনা
ভূমিকা: ইসলামী শরীআতে মানবজীবনের সকল ক্ষেত্রের সুষ্ঠু দিকনির্দেশনা রয়েছে । কুরআন ও সুন্নাহতে প্রত্যেক বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ সবসময় সুস্পষ্টভাবে পাওয়া না গেলেও মূলনীতিগত আলোচনার মাধ্যমে নতুন সমস্যার সমাধান করার সুযোগ রয়েছে । মানবসমাজ দিন দিন পরিবর্তিত হচ্ছে; উদ্ভাবিত হচ্ছে নতুন নতুন সমস্যা ও পরিস্থিতি । আর সেই সব অমীমাংসিত বিষয়ে শরীয়তের মূল উৎসসমূহ থেকে সাদৃশ্য গ্রহণ করে বিধান নির্ণয়ের প্রক্রিয়াকেই বলা হয় কিয়াস (Qiyas) । কিয়াস হলো ইসলামী ফিকহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যার মাধ্যমে কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার আলোকে নতুন সমস্যার শরয়ী বিধান নির্ধারণ করা হয় । কিয়াসের প্রয়োগ ফিকাহ শাস্ত্রকে পরিপূর্ণতা প্রদান করেছে এবং ইসলামী আইনকে যুগোপযোগী ও প্রয়োগযোগ্য করে রেখেছে।
কিয়াসের সংজ্ঞা (পরিচয়):
আভিধানিক অর্থ: কিয়াস শব্দটি আরবি "قاس يقيس قياسا" ধাতু থেকে এসেছে , যার অর্থ হলো মাপা, তুলনা করা, পরিমাপ করা বা সাদৃশ্য স্থাপন করা।
পরিভাষাগত সংজ্ঞা: কিয়াস হলো-"মূল দলিল দ্বারা কোনো অজানা ঘটনার বিধান নির্ধারণ করা, এ শর্তে যে উভয়ের মধ্যে বর্ণিত হুকুমের কার্যকরী কারণ (ইল্লত) একই ধরনের হয়ে থাকে।"
ইমাম গাজ্জালী (রহ.) এর মত: "কিয়াস হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বিদ্যমান শরয়ী বিধান নতুন ঘটনার উপর সময়ে উপযোগীভাবে প্রযোজ্য করা হয়, উভয়ের মধ্যে বর্ণিত ইল্লতের মিলের ভিত্তিতে।"
কিয়াসের রুকন (মূল ভিত্তি): উলামায়ে উসূলুল ফিকহ কিয়াসের চারটি মূল রুকন উল্লেখ করেছেন:
1. আসল: যে বিষয়ে কুরআন বা সুন্নাহতে স্পষ্ট শরয়ী বিধান রয়েছে । (যেমন: মদ)
2. ফর' (শাখা): যে নতুন বিষয়ের বিধান নির্ণয় করতে হবে । (যেমন: গাঁজা/আধুনিক নেশাদ্রব্য)
3. হুকুম: আসল বিষয়ের নির্ধারিত শরয়ী বিধান । (যেমন: মদের হুকুম- হারাম)
4. ইল্লত (কার্যকরী কারণ): যে যৌক্তিক ও কার্যকরী কারণের ভিত্তিতে উভয় বিষয়ের মধ্যে তুলনা করা হয় । (যেমন: মদের ইল্লত- নেশা/বুদ্ধি লোপ পাওয়া)
কিয়াসের হুকুম (বিধান): ইসলামী শরীয়তে কিয়াস গ্রহণযোগ্য ও বৈধ দলিল । তবে এটি প্রয়োগযোগ্য তখনই, যখন কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা দ্বারা বিষয়টি সরাসরি নির্ধারিত না থাকে । সেহেতু কিয়াসের হুকুম হলো ওয়াজিব (অপরিহার্য) । কারণ কিয়াস ব্যতীত নতুন সমস্যার শরয়ী সমাধান অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা শরীয়তের উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধে যায়।
কিয়াস দলিল হওয়ার প্রমাণ (প্রমাণ ও যুক্তি):
১. আল-কুরআন থেকে: আল্লাহ তাআলা বলেন: "হে বুদ্ধিমান লোকগণ! তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো ।" (সূরা হাশর, ২) । এ আয়াত দ্বারা বোঝা যায় যে নতুন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বুদ্ধি ও বিচার-বিবেচনা ব্যবহার করতে হবে, যা কিয়াসের ভিত্তি ।
আরেকটি আয়াতে নিষিদ্ধ বস্তুর কারণের ভিত্তিতে কিয়াসের প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন: "হে বিশ্বাসীরা! তোমরা মদ, জুয়া, মূর্তি ও ভাগ্য গণনা থেকে দূরে থাকো..." (সূরা মায়েদাহ, ৯০) । এখানে নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ বা ইল্লত হলো: অর্থহানি, বিবাদ সৃষ্টি ও নৈতিকতা নষ্ট । এই ইল্লতের ভিত্তিতে আধুনিক জুয়ার যেকোন মাধ্যম, অনলাইন বেটিং, লটারি ইত্যাদিও নিষিদ্ধ হবে, যা কিয়াসের প্রমাণ ।
২. হাদিস থেকে: রাসূলুল্লাহ (সা.) মাআয ইবন জাবাল (রা.) কে ইয়েমেনে বিচারক হিসেবে পাঠানোর সময় জিজ্ঞেস করেন: "তুমি কীভাবে বিচার করবে ?" তিনি বলেন: "কুরআন দ্বারা ।" রাসূল (সা.) আবার জিজ্ঞেস করেন: "আর যদি কুরআনে না পাও ?" তিনি বলেন: "সুন্নাহ দ্বারা ।" যদি সেখানে ও না পাও? তিনি বলেন: "তাহলে নিজের মতানুযায়ী ইজতিহাদ (কিয়াস) করবো ।" (হাদিস: আবু দাউদ, তিরমিজি) । এ বর্ণনা কিয়াস গ্রহণযোগ্যতার সরাসরি দলিল ।
৩. সাহাবাদের আমল: হজরত উমর (রা.), আলী (রা.), ইবন মাসউদ (রা.), ও যাইনুল আবেদিন (রা.) সহ বহু সাহাবী কিয়াসের ভিত্তিতে শরয়ী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন ।
যেমন- মাতৃহত নারী হত্যার ক্ষেত্রে দিয়া (রক্তপণ) জরিমানার সিদ্ধান্ত কিয়াসের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় ।
কিয়াসের প্রয়োগ উদাহরণ:
- মুল দলিল: খেজুর, কিসমিস, গম, যব ইত্যাদিতে সুদ নিষেধ।
- ইল্লত: পরিমাপযোগ্য, সঞ্চয়যোগ্য, লেনদেনেযোগ্য খাদ্যপন্য।
- ফর: চাল, চা, কফি, চিনি, অধুনিক দালাল বাজার।
- হুকুম: সুদের লেনদেনে নিষিদ্ধ।
কিয়াসের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:
- নতুন সমস্যার শারঈ সমাধান প্রদান করে ।
- শরীয়তের চিরকালীন ব্যপ্তি ও উন্নত উদাহরণ উপস্থাপন করে ।
- উম্মতের জন্য জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শরীয়াহ পথ উন্মুক্ত রাখে ।
- বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির আলোকে নতুন বিধান দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে ।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, কিয়াস ইসলামী শরীয়তের একটি মৌলিক দলিল, যা কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার পর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস । ক্রমবর্ধমান সামাজিক পরিবর্তন ও জটিল জীবনের প্রশ্নে কিয়াস ছাড়া শরীয়াহকে প্রয়োগযোগ্য ও কার্যকর রাখা সম্ভব নয় । কিয়াস মুসলিম উম্মাহকে শরীয়তের অধীনে জীবনব্যবস্থা পরিচালনায় সাহায্য করে এবং ফিকহ শাস্ত্রকে পরিপূর্ণতা প্রদান করে । তাই যথার্থ ইল্লত নির্ধারণ ও গভীর জ্ঞানী মুজতাহিদদের মাধ্যমে কিয়াসের প্রয়োগ ইসলামী সমাজে অপরিহার্য ।