দাওয়াতি পদ্ধতি – কোরআনের নির্দেশনা ও নববী কার্যবলী

ভূমিকা: দাওয়াত বা دعوة ইসলামি পরিভাষায় অর্থ হলো মানুষের সামনে আল্লাহর বাণী পেশ করা, মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, তাদেরকে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বোঝানো এবং সঠিক জীবন-ব্যবস্থার দিকে পথ প্রদর্শন করা। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, আর এই ব্যবস্থাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মূল দায়িত্ব আল্লাহর রাসূলগণ এবং তাদের অনুসারীদের ওপর অর্পিত হয়েছে।

কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন – وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِّمَّنْ دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ

আর সেই ব্যক্তির কথা অপেক্ষা উত্তম আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সৎকাজ করে এবং বলে যে, আমি তো মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।

(সূরা ফুস্সিলাত: ৩৩)

এই আয়াতের মাধ্যমে দাওয়াতকে সর্বোত্তম কাজ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

দাওয়াতের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ইসলামে দাওয়াতের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি নবীদের মৌলিক দায়িত্ব ছিল। কোরআনে বারবার উল্লেখ আছে যে, প্রতিটি নবী-রাসূল তাদের জাতির কাছে গিয়েছেন শুধু একটিই বার্তা নিয়ে:

أَنِ ٱعْبُدُواْ ٱللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَـٰهٍ غَيْرُهُ

তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো উপাস্য নেই।

(সূরা আল-আরাফ: ৫৯)

রাসূলুল্লাহ তাঁর ২৩ বছরের নবুওয়তী জীবনে মক্কা ও মদিনায় দাওয়াতকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি কখনো গোপনে, কখনো প্রকাশ্যে, কখনো ব্যক্তিগতভাবে, আবার কখনো জনসম্মুখে মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকতেন।

কোরআনের নির্দেশনায় দাওয়াতি পদ্ধতি:

১. হিকমাহর মাধ্যমে দাওয়াত

আল্লাহ বলেন

ٱدْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِٱلْحِكْمَةِ وَٱلْمَوْعِظَةِ ٱلْحَسَنَةِ وَجَـٰدِلْهُم بِٱلَّتِى هِىَ أَحْسَنُ

তুমি তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো হিকমাহ (জ্ঞান ও প্রজ্ঞা), সুন্দর উপদেশ এবং উত্তম পদ্ধতিতে বিতর্কের মাধ্যমে।

(সূরা নাহল: ১২৫)

এই আয়াত দাওয়াতি কর্মে তিনটি মূলনীতি দিয়েছে

  • হিকমাহ (প্রজ্ঞা)
  • মওইযাতুল হাসানাহ (সুন্দর উপদেশ)
  • জিদাল বিল্লাতি হিয়া আহসান (উত্তম পদ্ধতিতে সংলাপ/বিতর্ক)

২. ধৈর্য ও সহনশীলতা

দাওয়াতের পথে বাধা-বিপত্তি আসবে। আল্লাহ বলেন – وَٱصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِٱللَّهِ

তুমি ধৈর্য ধারণ করো, আর তোমার ধৈর্য তো আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কিছুই নয়।

(সূরা নাহল: ১২৭)

৩. কোমল ব্যবহার

মুসা (আ.) ও হারুন (আ.)-কে ফেরাউনের কাছে পাঠানোর সময় আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছিলেন

فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَّيِّنًا لَّعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَىٰ

তোমরা তার সঙ্গে কোমলভাবে কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।

(সূরা ত্বাহা: ৪৪)

এখান থেকে বোঝা যায়, দাওয়াত কখনো রূঢ় বা কঠোর ভঙ্গিতে দেওয়া উচিত নয়।

নববী কার্যবলী ও দাওয়াতি ধাপসমূহ:

রাসূলুল্লাহ -এর দাওয়াতি জীবনকে মোটামুটি তিন ধাপে ভাগ করা যায়:

১. মক্কার গোপন দাওয়াত (৩ বছর)

প্রথমে নবী অল্প কয়েকজন নিকট আত্মীয় ও বন্ধুদের দাওয়াত দেন। আবু বকর, আলী, খাদিজা (রা.) প্রাথমিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন।

২. প্রকাশ্য দাওয়াত

আল্লাহর নির্দেশ এলো – فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ ٱلْمُشْرِكِينَ

তুমি যা আদিষ্ট, তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করো এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও।

(সূরা হিজর: ৯৪)

এরপর নবী প্রকাশ্যে কুরাইশদের সামনে ইসলাম প্রচার শুরু করেন।

৩. মদিনা পর্ব

হিজরতের পর মদিনায় ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে দাওয়াতের পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন-কানুন প্রণয়ন, জিহাদ, শান্তি-চুক্তিসব কিছুর মধ্যে দাওয়াতের প্রভাব সুস্পষ্ট।

রাসূল -এর দাওয়াতি বৈশিষ্ট্য

১. সততা ও আমানতদারিত্ব – “আল-আমীনহিসেবে তিনি দাওয়াত শুরু করেছিলেন।

২. আদর্শ জীবনতাঁর চরিত্রই ছিল দাওয়াতের বড় মাধ্যম।

৩. সহিষ্ণুতাতায়েফের অপমান, উহুদের আঘাত, মক্কার নির্যাতন সবকিছু তিনি ধৈর্যসহকারে সহ্য করেছেন।

৪. দোয়াতিনি শত্রুদের জন্যও দোয়া করেছেন: اللهم اهْدِ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ

হে আল্লাহ, আমার জাতিকে হিদায়াত দিন, কারণ তারা জানে না।

দাওয়াতের আদব ও করণীয়

১. নিজে আমল করাদাওয়াতকারীর জীবন যেন কথার সঙ্গে মিলে যায়।

২. ধাপে ধাপে দাওয়াতআগে তাওহীদ, পরে সালাত, এরপর অন্যান্য বিষয়।

৩. মানুষের অবস্থা অনুযায়ী কথা বলাহিকমাহর সঙ্গে মানানসই উপায়ে।

৪. একতা ও ভালোবাসা সৃষ্টি করাবিভেদ নয়, বরং একত্র করা।

বর্তমান যুগে দাওয়াতি দায়িত্ব

বর্তমান সময়ে দাওয়াত শুধুমাত্র মসজিদের মিম্বার বা দাওয়াতি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আজকের দাওয়াতের মাধ্যম আরও বিস্তৃত

  • বই, পত্রিকা, ওয়েবসাইট, সোশ্যাল মিডিয়া
  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংগঠন
  • আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও শান্তি বার্তা

কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে দাওয়াতের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভীতি জাগ্রত করা এবং ইসলামি মূল্যবোধ সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা।

উপসংহার: দাওয়াতি কাজ হচ্ছে নবীদের উত্তরাধিকার। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ এবং মানবতার কল্যাণের জন্য আমাদের প্রত্যেকের উচিত দাওয়াতি কাজে অংশ নেওয়া। কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত দাওয়াতি নীতিমালা যেমন হিকমাহ, ধৈর্য, কোমল ব্যবহার এবং আমলের সামঞ্জস্য বজায় রেখে যদি আমরা কাজ করি, তবে ইনশাআল্লাহ ইসলাম সমগ্র মানবজাতির কাছে আলোর পথ হয়ে উঠবে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url