মক্কা ও মদিনার যুগে দাওয়াতের ঐতিহাসিক বিকাশ
ভূমিকা: ইসলামের ইতিহাসে দাওয়াতি কর্মই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নবী মুহাম্মদ ﷺ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত ওহির মাধ্যমে মানবজাতিকে তাওহীদের দিকে আহ্বান করেছেন। তাঁর দাওয়াতি জীবনকে সাধারণত দুটি প্রধান পর্বে ভাগ করা হয়—
১. মক্কা যুগ (১৩ বছর)
২. মদিনা যুগ (১০ বছর)
এই দুই যুগের দাওয়াতি রূপ, কৌশল, চ্যালেঞ্জ এবং সাফল্যের ভেতরে ইসলামি আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ প্রতিফলিত হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন –
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
“ তিনিই তাঁর রাসূলকে পাঠিয়েছেন হিদায়াত ও সত্য দ্বীন নিয়ে, যাতে তিনি একে সমগ্র ধর্মের উপর বিজয়ী করেন, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।”
(সূরা আস-সাফ: ৯)
মক্কা যুগে দাওয়াতের বিকাশ (৬১০–৬২২ খ্রিঃ)
১. গোপন দাওয়াতের ধাপ (৩ বছর)
রাসূল ﷺ যখন প্রথম ওহি লাভ করেন غار حراء (হেরা গুহা)-তে, তখন তিনি গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়েন। হযরত খাদিজা (রা.) তাঁকে সাহস দেন এবং হযরত ওয়ারাকা ইবন নওফল ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে, এ নবুওয়তী দায়িত্ব।
প্রথম দিকে দাওয়াত সীমিত রাখা হয়েছিল। এই ধাপে ইসলাম গ্রহণ করেন—
- খাদিজা (রা.)
- আলী (রা.)
- আবু বকর (রা.)
- যায়েদ ইবন হারিসা (রা.)
গোপন দাওয়াতের লক্ষ্য ছিল একটি ছোট
কিন্তু দৃঢ় ঈমানি ভিত্তি তৈরি করা।
২. প্রকাশ্য দাওয়াত (দারুল আর্কাম পর্ব)
কিছু সাহাবি ইসলাম গ্রহণের পর নবী ﷺ দারুল আর্কাম নামক একটি ঘরে সাহাবিদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতেন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে দাওয়াতের বীজ ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
৩. আল্লাহর আদেশে প্রকাশ্য ঘোষণা
আল্লাহ নির্দেশ দিলেন – فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ
“তুমি যা আদিষ্ট, তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করো এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও।”
(সূরা হিজর: ৯৪)
এই নির্দেশ পাওয়ার পর রাসূল ﷺ প্রথমে নিকটাত্মীয়দের সমবেত করে দাওয়াত দেন। পরে মক্কার কুরাইশদের প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের দিকে আহ্বান জানান।
৪. বিরোধিতা ও নির্যাতন
মক্কার প্রভাবশালী নেতারা নবী ﷺ-এর দাওয়াত মানতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে মুসলমানরা নানাভাবে নির্যাতিত হন। উদাহরণস্বরূপ—
- বিলাল (রা.)-কে মরুভূমির উত্তাপে
শুইয়ে নির্যাতন করা
- ইয়াসির পরিবার শহীদ হওয়া
- নবী ﷺ-এর প্রতি
উপহাস, অর্থনৈতিক বয়কট
তবুও নবী ﷺ ধৈর্য ধারণ করে
দাওয়াত চালিয়ে যান।
৫. হিজরত আবিসিনিয়ায়
নির্যাতন বৃদ্ধি পেলে কিছু মুসলমানকে হিজরত করতে বলা হয়। আবিসিনিয়ার (ইথিওপিয়া) নাজাশীর কাছে তারা নিরাপদ আশ্রয় পান। এভাবেই দাওয়াত মক্কার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে।
৬. তায়েফ সফর
মক্কার জনগণ প্রত্যাখ্যান করলে নবী ﷺ তায়েফে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি প্রবল অপমানের শিকার হন। কিন্তু তাঁর দোয়া ছিল – اللَّهُمَّ اهْدِ قَوْمِي فَإِنَّهُمْ لا يَعْلَمُونَ
“হে আল্লাহ, আমার
জাতিকে হিদায়াত দিন, নিশ্চয়ই তারা জানে না।”
৭. বাইআতুল আকাবা ও মদিনার প্রস্তুতি
হজ মৌসুমে মদিনার কিছু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূল ﷺ-কে মদিনায় আসার আমন্ত্রণ জানান। এভাবে মক্কার দাওয়াত ধীরে ধীরে মদিনার দিকে অগ্রসর হয়।
মদিনা যুগে দাওয়াতের বিকাশ (৬২২–৬৩২ খ্রিঃ)
১. হিজরতের পর নতুন সূচনা
রাসূল ﷺ যখন মদিনায় আগমন করেন, তখন তিনি একটি ইসলামি সমাজ গড়ে তোলার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন—
- মসজিদে নববী নির্মাণ
- মুহাজির ও আনসারের ভ্রাতৃত্ব
প্রতিষ্ঠা
- মদিনা সনদ (دستور
المدينة) প্রণয়ন
২.
মদিনায় দাওয়াতি পরিবেশ
মক্কার মতো ভয়াবহ বিরোধিতা না থাকায়
এখানে দাওয়াতের ক্ষেত্র বিস্তৃত হয়। মুসলমানদের একটি স্বাধীন কেন্দ্র গড়ে ওঠে, যেখানে
ইসলামি শিক্ষা, শাসনব্যবস্থা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
৩.
ইহুদি ও মুনাফিকদের সঙ্গে সম্পর্ক
মদিনায় কিছু ইহুদি গোত্র এবং মুনাফিকদের উপস্থিতি দাওয়াতের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। রাসূল ﷺ তাদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেন, তবে যখন তারা চুক্তিভঙ্গ করে, তখন ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
৪. জিহাদ ও দাওয়াত
মদিনা যুগে ইসলামের রক্ষার জন্য বিভিন্ন যুদ্ধ সংঘটিত হয়—
- বদর (২ হিজরি)
- উহুদ (৩ হিজরি)
- খন্দক (৫ হিজরি)
এসব যুদ্ধ শুধু সামরিক লড়াই নয়, বরং
ইসলামের অস্তিত্ব ও দাওয়াতকে টিকিয়ে রাখার লড়াই ছিল।
৫. হুদাইবিয়ার সন্ধি
৬ হিজরিতে হুদাইবিয়ার সন্ধি হয়, যা প্রথমে মুসলমানদের জন্য কঠিন মনে হলেও পরবর্তীতে দাওয়াতের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়। আল্লাহ বলেন – إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا
“নিশ্চয়ই আমি তোমাকে স্পষ্ট বিজয় দান করেছি।”
(সূরা আল-ফাতহ: ১)
৬. আন্তর্জাতিক দাওয়াত
রাসূল ﷺ বিভিন্ন রাজা ও সম্রাটদের কাছে ইসলামি দাওয়াতি চিঠি পাঠান—
- কিসরা (পারস্য সম্রাট)
- কায়সার (রোম সম্রাট)
- মিসরের মুকাওকিস
- হাবশার নাজাশী
এভাবে ইসলামি দাওয়াত আরব উপদ্বীপ ছাড়িয়ে
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবেশ করে।
৭.
মক্কার বিজয় (ফাতহে মক্কা)
৮ হিজরিতে মক্কা বিজিত হলে নবী ﷺ সকল শত্রুকে
ক্ষমা করে দেন। তিনি বলেছিলেন –
اذهبوا فأنتم
الطلقاء
“তোমরা যাও, আজ
তোমরা সবাই মুক্ত।”
এই মহৎ দাওয়াতি আচরণের ফলে হাজারো মানুষ
ইসলাম গ্রহণ করে।
৮.
বিদায় হজ ও শেষ দাওয়াত
১০ হিজরিতে বিদায় হজে নবী ﷺ শেষ দাওয়াতি
বক্তব্য প্রদান করেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন –
أَلَا هَلْ
بَلَّغْتُ؟
“আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?”
সাহাবারা বললেন: “জি, নিশ্চয়ই।”
তিনি বললেন: اللهم فاشهد – “হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী থাকো।”
তুলনামূলক
বিশ্লেষণ
|
বিষয় |
মক্কা যুগ |
মদিনা যুগ |
|
দাওয়াতের ধরন |
তাওহীদ-কেন্দ্রিক, ধৈর্য, সহনশীলতা |
সমাজ
গঠন, আইন, জিহাদ, আন্তর্জাতিক দাওয়াত |
|
অবস্থা |
সংখ্যালঘু
ও নির্যাতিত |
রাষ্ট্রীয়
ক্ষমতা ও সংগঠিত সমাজ |
|
শত্রুর রূপ |
কুরাইশ
মুশরিক |
ইহুদি, মুনাফিক, বাইরের
শক্তি |
|
ফলাফল |
ক্ষুদ্র
সম্প্রদায় গঠন |
বিশ্বব্যাপী
প্রসার ও প্রতিষ্ঠা |
উপসংহার
মক্কা ও মদিনার দাওয়াতি পর্ব ইসলামের
ইতিহাসে এক অনন্য শিক্ষা। মক্কায় দাওয়াত ছিল ধৈর্য,
সহিষ্ণুতা ও ঈমান শক্তির পরীক্ষা। আর
মদিনায় দাওয়াত রূপ নিয়েছিল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা,
আইন প্রণয়ন ও আন্তর্জাতিক প্রচারে।
আজকের যুগে দাওয়াতকারীদের উচিত উভয়
যুগের শিক্ষা গ্রহণ করা—মক্কার মতো ধৈর্য,
ত্যাগ ও ঈমান দৃঢ়তা এবং মদিনার মতো
সংগঠন, নেতৃত্ব ও কৌশল।