সুরা আল-ফাতেহার তাফসীর ( বিস্তারিত ও সহজ ভাষায় )
সূরা আল-ফাতেহা আল-কুরআনের সর্বপ্রথম অধ্যায়, যার মাধ্যমে সমগ্র কুরআনের দরজা খুলে যায়। এজন্যই এর নাম “ফাতেহা”—অর্থ “উদ্বোধন” বা “প্রারম্ভিক অধ্যায়”।
এটি মাত্র সাত আয়াতের একটি ছোট সূরা, কিন্তু এর গভীরতা এবং গুরুত্ব এত বিশাল যে একে বলা হয় কুরআনের সারমর্ম। রাসূল ﷺ বলেছেন—
“আল-ফাতেহা হলো কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরা।”
এটি মুসলমানরা প্রতিদিন সালাতে বারবার পড়ে—কারণ নামাজে আল-ফাতেহা ব্যতীত সালাত পূর্ণ হয় না। তাই এই সূরার যথাযথ ব্যাখ্যা জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুরা আল-ফাতেহার মূল পরিচয়
সূরার নামসমূহ
আল-ফাতেহার বিভিন্ন নাম রয়েছে—
- উম্মুল কিতাব (কিতাবের মা)
- আস-সাব্উল মাসানি (বারবার পাঠ করা সাত আয়াত)
- আশ-শিফা (আরোগ্যদাতা)
- আল-হামদ (প্রশংসা)
প্রতিটি নাম সূরাটির বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে।
নাযিলকাল ও অবস্থান
আল-ফাতেহা মক্কায় নাযিল হয়। এটি কুরআনের ১ম সূরা এবং ৭টি আয়াত সম্বলিত।
সুরা আল-ফাতেহার আয়াত অনুযায়ী ব্যাখ্যা (তাফসীর)
১ম আয়াত: “بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ”
অর্থ: “পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।”
এটি আল্লাহর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গুণের কথা মনে করিয়ে দেয়—
১. আল্লাহর নামের বরকত দিয়ে কাজ শুরু
জীবনের প্রতিটি কাজ “বিসমিল্লাহ” দিয়ে শুরু করা ইসলামের সুন্দর শিক্ষা। এতে শয়তান দূরে থাকে, কাজে বরকত আসে এবং আল্লাহর সাহায্য লাভ হয়।
২. الرحمن — পরম করুণাময়
এই গুণ কেবল আল্লাহর জন্য; তিনি তাঁর সকল সৃষ্টি—মানুষ, পশু, পাখি, মুমিন–কাফির—সবার প্রতি দয়া করেন।
৩. الرحيم — বিশেষভাবে দয়ালু
এটি মূলত আল্লাহর মুমিন বান্দাদের জন্য বিশেষ রহমতের প্রতীক।
২য় আয়াত: “الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ”
অর্থ: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সমগ্র বিশ্বের প্রতিপালক।
১. সমস্ত প্রশংসা শুধু আল্লাহর
মানুষ যেকোনো ভালো কাজ করলেও মূল শক্তি, সামর্থ্য এবং পরিবেশ আল্লাহই দেন। তাই প্রকৃত প্রশংসা তাঁরই।
২. রাব্ব — প্রতিপালক
“রাব্ব” শব্দের অর্থ—
সৃষ্টি করা
রিজিক দেওয়া
নিয়ন্ত্রণ করা
ধাপে ধাপে লালন-পালন করা
এভাবে আল্লাহ সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিটি কণাকে নিয়ন্ত্রণ করেন।
৩. আল-‘আলামীন — সৃষ্টির সমগ্র জগত
মানুষ, ফেরেশতা, জ্বিন, প্রাণী, গ্রহ-নক্ষত্র, অদৃশ্য জগৎ—সবই “আলামীন”-এর অন্তর্ভুক্ত।
৩য় আয়াত: “الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ”
অর্থ: “পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু।”
এখানে পুনরায় আল্লাহর দুটি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে। এটি আল্লাহর প্রেম, দয়া ও উত্তম সত্তাকে স্মরণ করায়।
মুমিন যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন সে বুঝতে পারে—আল্লাহর সামনে দাঁড়ালেও তিনি কঠোর শাসক নন; বরং তিনি দয়ালু, ক্ষমাশীল।
৪র্থ আয়াত: “مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ”
অর্থ: “প্রতিফল দিবসের মালিক।”
১. মালিক — অধিকারী ও শাসক
আল্লাহ দুনিয়ার পাশাপাশি পরকালেরও একমাত্র মালিক।
২. ইয়াওমুদ্দীন — প্রতিফল বা বিচার দিবস
মানুষের দুনিয়ার প্রতিটি কাজের হিসাব নেওয়া হবে—
ভালো কাজের পুরস্কার
গোনাহের শাস্তি
ন্যায়বিচারের সর্বোচ্চ রূপ
৩. এই আয়াত আমাদের মনে ভয় সৃষ্টি করে
কারণ দুনিয়ায় মানুষ সীমাহীন স্বাধীনতা পেলেও কিয়ামতের দিনে সে সম্পূর্ণভাবে দায়বদ্ধ হবে।
৫ম আয়াত: “إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ”
অর্থ: “আমরা শুধু তোমার ইবাদত করি এবং শুধু তোমারই সাহায্য চাই।”
এটি আল-ফাতেহার হৃদয় বা কেন্দ্রবিন্দু।
১. শুধু আল্লাহর ইবাদত করার অঙ্গীকার
ইবাদত বলতে যা বোঝায়—
- নামাজ
- রোজা
- দোয়া
- তাওহিদ
- আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালোবাসা
মানুষ আল্লাহ ছাড়া কারো সামনে মাথা নত করবে না।
২. সাহায্যের প্রকৃত উৎস একমাত্র আল্লাহ
দুনিয়ায় যেই সাহায্য করুক—ওই সাহায্যের প্রকৃত উৎস আল্লাহ।
এই আয়াত মানুষকে অহংকারমুক্ত করে এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা শেখায়।
৬ষ্ঠ আয়াত: “اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ”
অর্থ: “আমাদের সরল পথ প্রদর্শন কর।”
১. হিদায়াত (সঠিক দিকনির্দেশ) আল্লাহ ছাড়া কেউ দিতে পারে না
এই দোয়া হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দোয়া।
২. সরল পথ বলতে বোঝানো হয়েছে—
- ঈমানের পথ
- আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ﷺ -এর আনুগত্য
- সত্য, ন্যায় ও ধার্মিকতা
- চরমপন্থা ও ভ্রান্ত পথ থেকে দূরে থাকা
৩. প্রতিটি নামাজে এই দোয়া করা হয়
কারণ ঈমান বজায় রাখা কঠিন; তাই নিয়মিত হিদায়াত চাইতে হয়।
৭ম আয়াত: “صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ”
অর্থ: “সেসব ব্যক্তিদের পথ, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছো।”
কারা আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত?
কুরআন বলেছে—
- নবীগণ
- সত্যবাদী ব্যক্তিগণ
- শহীদগণ
- সৎকর্মবান মানুষ
(সূরা নিসা ৬৯)
এই শ্রেণির মানুষের অনুসরণই প্রকৃত সফলতা।
“غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ”
অর্থ: “যাদের প্রতি তোমার ক্রোধ নাযিল হয়েছে তাদের পথ নয়।”
এগুলি সেই লোক, যারা জেনে–বুঝে সত্য প্রমাণ অস্বীকার করেছে।
ইহুদি জাতি এ ধরনের এক উদাহরণ (হাদিসে ব্যাখ্যা এসেছে)।
“وَلَا الضَّالِّينَ”
অর্থ: “এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে তাদের পথও নয়।”
এদের জ্ঞান কম বা পথে ভুল বুঝে বিপথে গেছে।
খ্রিস্টানদের উদাহরণ উল্লেখ আছে।
সুরা আল-ফাতেহার ফজিলত
১. কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরা
নবী ﷺ বলেছেন—
“এটি কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরা।”
২. নামাজে আল-ফাতেহা ছাড়া নামাজ হয় না
হাদিসে এসেছে—
“যে ব্যক্তি ফাতেহা পাঠ করবে না, তার নামাজ নেই।”
৩. রোগ থেকে আরোগ্যের দোয়া
একটি সহিহ হাদিসে বলা হয়েছে—
সাহাবিরা আল-ফাতেহা পড়ে একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে রুকইয়াহ করলে সে সুস্থ হয়ে যায়।
তাই এ সূরাকে বলা হয়— “সূরা আশ-শিফা”।
৪. আল-ফাতেহা হলো দোয়া + আল্লাহর প্রশংসার সমন্বয়
প্রথম তিন আয়াতে আল্লাহর প্রশংসা, পরের অংশে বান্দার দোয়া—এটি দোয়ার একটি নিখুঁত কাঠামো।
সুরা আল-ফাতেহার শিক্ষা ও বার্তা
১. আমাদের জীবনে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতা
আল্লাহর প্রশংসা, দয়া, মালিকানা—সবকিছু আমাদের স্মরণ করায় যে দুনিয়া–আখিরাত তিনি ছাড়া কেউ নিয়ন্ত্রণ করেন না।
২. তাওহিদের শিক্ষা
“ইয়্যাকা নাআবুদু”—শুধু তোমার ইবাদত
এটি তাওহিদের মূল ভিত্তি।
৩. আমল ও বিশ্বাস উভয়ই প্রয়োজন
নির্দেশিত পথ চাইতে হলে আমল থাকতে হবে।
৪. সঠিক দলিলসমৃদ্ধ পথ অনুসরণ
অন্ধ অনুসরণ নয়—যে পথে নবীগণ ও সৎলোকেরা চলেছে সে পথ বেছে নেওয়া।
৫. জীবনের প্রতিটি কাজে আল্লাহর সাহায্য প্রয়োজন
“ইয়্যাকা নাসতাঈন”—শুধু তোমার সাহায্য প্রার্থনা করি।
জীবনে যে কাজই করি, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া সফলতা নেই।
সুরা আল-ফাতেহার সারসংক্ষেপ
- মূল বার্তা - তাওহিদ, ইবাদত, দিকনির্দেশ প্রার্থনা
- ফজিলত - কুরআনের শ্রেষ্ঠ সূরা, শিফার সূরা
- শিক্ষা - সঠিক পথ, সৎ সমাজ, ঈমান, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা
- ব্যবহার - প্রতিটি নামাজে অপরিহার্য
উপসংহার: সুরা আল-ফাতেহা শুধু একটি সূরা নয়; এটি মুসলিম জীবনের রূপরেখা। এতে রয়েছে-
- আল্লাহর প্রশংসা
- তাঁর দয়া
- কিয়ামতের স্মরণ
- তাওহিদের ঘোষণা
- দোয়ার শিক্ষা
- সঠিক পথের অনুরোধ
এক কথায়, এটি হলো ইসলামের পূর্ণ দিকনির্দেশনা।
